নেতৃত্বে আসছেন পুতুল সভাপতি শেখ হাসিনা
আর মাত্র সাত দিন পরই ঐতিহ্যের রাজনৈতিক
দল আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত
২০টি জাতীয় সম্মেলন হয়েছে। ২০-২১ ডিসেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
অনুষ্ঠিত হবে দলটির ২১তম জাতীয় সম্মেলন। অতীতের প্রতিটি সম্মেলনে দলের
শীর্ষ পর্যায় থেকে কার্যনির্বাহী কমিটি পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছেন শত শত
নেতা। তবে এখন পর্যন্ত সভাপতি হয়েছেন ৭ জন। আবারো বর্তমান সভাপতি শেখ
হাসিনা থাকছেন। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে কে আসছেন তা নিয়ে চলছে
জল্পনা-কল্পনা। চা দোকান থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতেও একই আলোচনা।
জানা যায়, টানা তিন দফায় ক্ষমতায় থাকা
দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। মূলত তার ইমেজের ওপর ভর করেই
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করছে দলটি। দলটির লাখ লাখ কর্মী ও কোটি কোটি
সমর্থক মনে করছেন শেখ হাসিনাই আবারো সভাপতি পদে থাকছেন। কিন্তু সাংগঠনিক
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ সাধারণ সম্পাদক? ওবায়দুল কাদেরই থাকছেন না নতুন
কেউ আসছেন? ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টালে দেখা যায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের
সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ১০ জন। সবচেয়ে বেশি চারবার করে হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান ও জিল্লুর রহমান।
এ ছাড়া তাজউদ্দীন আহম্মদ তিনবার, আবদুর
রাজ্জাক, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী দুবার করে, প্রতিষ্ঠাতা
সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, আবদুল জলিল, ওবায়দুল কাদের একবার করে সাধারণ
সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এবারের সম্মেলনে প্রতিবারের মতোই সবার
কৌতূহল কে হচ্ছেন দলের সাধারণ সম্পাদক? কর্মীবান্ধব ওবায়দুল কাদের কী
সাধারণ সম্পাদক থাকছেন? না এ পদে পরিবর্তন আসবে? আর পরিবর্তন হলে কে আসবেন এ
পদে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীর চোখ এই একটি পদের দিকে।
দলটির বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানণ্ডিস্থ সভাপতির
রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন কার্যালয় ঘুরে দেখা গেছে
নেতাকর্মীর মধ্যে কে হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক তা নিয়ে চলছে আলোচনা, গুঞ্জন ও
বিতর্ক।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতার সঙ্গে
কথা বলে জানা যায়, ওবায়দুল কাদের কর্মীবান্ধব হিসেবে পরিচিত। টেকনাফ থেকে
তেঁতুলিয়া রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত ছুটে দলের নেতাকর্মীকে চাঙ্গা
রেখেছেন। জিল্লুর রহমানের পর দলটির নিকট অতীতের সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আবদুল জলিল ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সফল। কিন্তু আশরাফুল
ইসলাম পরিচ্ছন্ন হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও কর্মীদের তেমন সময় দিতেন না বলে
অভিযোগ ছিল। এ ক্ষেত্রে ওবায়দুল কাদেরের তুলনা শুধুই ওবায়দুল কাদের। ফলে
এবার সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। তিনি (ওবায়দুল কাদের)
এখন বেশ সুস্থ আছেন এবং দলের জন্য যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন।
সারাদেশে জেলা-উপজেলার সম্মেলনে উপস্থিত
হয়ে দল পুনর্গঠনে পরিশ্রম করছেন। এরপরও যদি দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা চান
তাহলে এ পদে পরিবর্তন আসবে। যা দলীয় গঠণতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী একান্তই শেখ
হাসিনার সিদ্ধান্ত। নেতাকর্মীর প্রত্যাশা, কর্মীবান্ধব এবং দল ও
নেতাকর্মীকে যথেষ্ট সময় দিতে পারবেন এমন নেতা যেন আওয়ামী লীগের সাধারণ
সম্পাদক হন। যিনি পুরোদস্তুর রাজনৈতিক ব্যক্তি। কারণ আওয়ামী লীগের মতো দলে
সাবেক আমলা জাতীয় নেতাদের সাধারণ সম্পাদক পদে বসানো দলের সাংগঠনিক
কর্মকাণ্ড সংকুচিত করার নামান্তর।
তবে এবার ওবায়দুল কাদের ছাড়াও সাধারণ
সম্পাদক পদে আরো আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী
ড. আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর
কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল ও নৌপরিবহন
প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এর বাইরেও আরো কয়েকজনের নাম নিয়ে আলোচনা
হচ্ছে নেতাকর্মীর মধ্যে। এ ছাড়া অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক
সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম
আলোচনায় রয়েছেন।
২০১৬ সালের ২২-২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের
২০তম জাতীয় সম্মেলন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ওবায়দুল কাদের। সে সময়
সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মরহুম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক
পদে রদবদল প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সভাপতি বাদে অন্য যেন কোনো পদে
পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বর্তমানে বেশ সুস্থ রয়েছেন এবং দ্বিতীয়বারের মতো
সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালনে অনীহা নেই।
এদিকে এ বছরের মার্চ মাচের শুরুতে ওবায়দুল
কাদের হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করে গুরুতর অসুস্থ হলে দলের পরবর্তী সাধারণ
সম্পাদক কে হবেন তা নিয়ে আলোচনার তৈরি হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ওবায়দুল
কাদের এখন পুরোপুরি সুস্থ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওবায়দুল কাদের ও ড.
আব্দুর রাজ্জাক উভয়ের বয়স ৬৮ থেকে ৭০ এর মধ্যে। মাহবুব-উল-আলম হানিফের বয়স
অপেক্ষাকৃত কম। দলে শক্ত অবস্থান তার। জাহাঙ্গীর কবির নানকের রাজনৈতিক
জীবনও বর্ণাঢ্য, কিন্তু গত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। তাকে বাদ দিয়ে
একজন স্থানীয় নেতাদের নমিনেশন দেয়া হয়। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নানকের
আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া আব্দুর রহমান ও বিএম মোজ্জামেল আলোচনা রয়েছেন। আর
সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সবার তুলনায় তরুণ। বয়স পঞ্চাশের
কাছাকাছি। অনেকেই মনে করছেন যদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণ কোনো নেতাকে
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেছে নেন তাতে খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর নাম অনেকটা
এগিয়ে থাকবে। এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন,
আসলে নেত্রীই ভালো জানেন কে হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক? তবে আমাকে তিনি
যেখানেই দায়িত্ব দেন সেখানেই নিষ্ঠার সাথে অতীতের মতো দায়িত্ব পালন করব।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ
গার্ডেনে জন্ম নেয়া আওয়ামী মুসলিম লীগ; ১৯৫৫ সালের তৃতীয় জাতীয় সম্মেলনে
‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগে শুরু থেকেই মাঠ পর্যায়
থেকে উঠে আসা নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রভাবশালী বা অভিজাত হিসেবে
পরিচিতরা সেভাবে দলের নেতৃত্বে আসেনি। দেশের অন্যান্য দল থেকে আওয়ামী লীগ
এই ক্ষেত্রে এখনো ব্যাতিক্রম।
নেতৃত্বে আসছেন পুতুল: আওয়ামী লীগের ২১তম
ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের
তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরাধিকারী হিসেবে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য
হতে যাচ্ছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দুই
সন্তান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিদ সজীব ওয়াজেদ জয় এবং অটিজম বিশেষজ্ঞ
সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম আলোচনায় রয়েছে। জয় ও পুতুলের মধ্যে এবার কেবল
একজনই কেন্দ্রীয় কমিটিতে ১ নম্বর সদস্য হিসেবে ঠাঁই পাচ্ছেন। আর একমাত্র
পুত্র জয় বর্তমানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসতে চান না, এটা তিনি এরই মধ্যে
বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও পারিবারিক আয়োজনে ইশারা-ইঙ্গিতে স্পষ্ট করেছেন। এ
পরিস্থিতিতে পুতুলই আসছে কমিটিতে স্থান পেতে যাচ্ছেন বলেই মনে করছেন আওয়ামী
লীগ নেতারা।
