শিনোনাম

বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বাপর রাজনীতি

সাতচল্লিশের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশের জন্ম, জন্মের অব্যবহিত পরেই তা থেকে উল্টোযাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্মের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় এসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকরা।
এর মধ্য দিয়ে কার্যত বাংলাদেশের আত্মপরিচয়কেই হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। পিতা হত্যার চুয়াল্লিশ বছর পরে এসে আজ বাংলাদেশ সেই উল্টোপথযাত্রা থেকে কতখানি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে সে বিশ্লেষণটা খুব জরুরি। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কী ছিল, আজকের বাংলাদেশে সেই বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনা গেল কিনা সেই সুলুকসন্ধান খুব প্রয়োজন। কারণ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে আজকের বাংলাদেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা না গেলে আসল বাংলাদেশকে আবার হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা দেখা দেবে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ মুক্তির নামে ভারতীয় উপমহাদেশকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়। ১৪ আগস্ট জন্মলাভ করল ‘মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান’। কিন্তু সেই পাকিস্তানের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালি কখনোই ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের পরিচয় নির্ধারণে আগ্রহী হয়নি। রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তাকে মুসলমানিত্ব বরণ করে নিতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আদতে নিজেদের বাঙালি চরিত্রই ধরে রেখেছিল তারা।
এর প্রমাণ পাকিস্তান সৃষ্টির পরপর ওই বছরই ভাষার প্রশ্নে আন্দোলনের সূচনা। ১৯৪৭-১৯৪৮ হয়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পথ ধরে সবশেষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম। এই সিকি শতকের প্রতি পদে পদে বাঙালি জাতি নিজেকে বাঙালি হিসেবেই পরিচয় দিয়েছে। কখনোই হিন্দু বা মুসলমান বা এরকম কোনো ধর্মভিত্তিক পরিচয়ে পরিচিত হয়নি। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ করে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি ভাবধারার হাত থেকে নিষ্কৃতি মেলে বাঙালির। জন্ম নেয় বাংলাদেশ। মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। নিঃসন্দেহে এই চেতনার মূল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের শাসনভার গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু নতুন এক লড়াই শুরু করেন। অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই। কিন্তু অর্থনীতি তো রাজনৈতিক দর্শনের ওপরই নির্ভর করে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারক হওয়ার কারণেই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ছিলো সাম্য ও সমাজতন্ত্র অভিমুখী। কারণ সাম্য ও সমাজতান্ত্রিক চেতনা ধারণ করতে ব্যর্থ হলে জাতীয়তাবাদ সেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে। এই সমাজতন্ত্রের রূপ একেক দেশে একেক সমাজে একেক রকম হতে পারে। চীনের সমাজতন্ত্র কিংবা রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজতন্ত্রের রূপকে একাকার করার চিন্তা সেদিনও যারা করেছিলেন, তারা ভুল করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার মতো করে সাম্য ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সমাজতন্ত্রের আভিধানিক সংজ্ঞা ও রূপের সঙ্গে তাকে হয়তো মেলানো যাবে না। এ নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে- বাকশাল আদৌ কি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা-অভিমুখী ছিল নাকি গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার টুঁটি চেপে ধরে এক দলীয় ও এক ব্যক্তিক শাসন ব্যবস্থার রূপ ছিল। এ বিতর্ক কিন্তু আজকের দুনিয়ায় অন্যান্য স্বীকৃত সমাজতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রেও হতে পারে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতেই এক দলীয় শাসন। সেখানে অন্য কোনো দলের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় না। চীন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া অন্য কোনো পার্টি নেই। সেখানে নির্বাচন হয় না, পার্টির সিদ্ধান্তেই মসনদের দায়িত্ব বদল হয়। আর বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি যে সমাজতান্ত্রিক উত্তর কোরিয়ার পূজা করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে, সেখানে মানুষের মৌলিক কোনো গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি নেই এবং সেখানে রাজার ছেলেই রাজা নির্বাচিত হন। ফলে সমাজতন্ত্র নিয়ে আধুনিক এই পুঁজিবাদী বিশ্বে নানামুখী তর্ক তো আছেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর বাকশাল তথা সমাজতন্ত্রমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টায় কারা কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল? বঙ্গবন্ধু সরাসরি কাদের স্বার্থের উপর আঘাত করে ফেলেছিলেন?
পাকিস্তানি শাসক আর তার নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীন দেশটিতে পাকিস্তানি ভাবধারা বিদ্যমান ছিল শক্তভাবেই। পরাজিত শত্রুদের দেশীয় দোসররা তো ছিলই। আর তার সঙ্গে বিশ্বমোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল। ছিল চীন, ছিল সৌদি আরব। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র, সমাজতান্ত্রিক চীন আর ধর্মীয় মৌলবাদী সৌদি আরব নীতিগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন দর্শনের রাষ্ট্র হলেও ভ‚-রাজনীতির মারপ্যাঁচে প্রায়ই এক বিন্দুতে এসে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নেও এরা এক বিন্দুতেই ছিল। তারা প্রত্যেকেই নিপীড়ক পাকিস্তানের সঙ্গী ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল অকুণ্ঠভাবে। বর্তমান সময়েরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমান নির্যাতন প্রশ্নে, চীনের উইঘুর মুসলমান দমনের প্রশ্নে কিংবা ইয়েমেনের মুসলমান নিধনের প্রশ্নে এরা এক বিন্দুতেই দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এদেশের আপামর জনসাধারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি-সচেতন ছাত্র-শিক্ষক ও কিছু মুক্তিকামী বুদ্ধিজীবী আর বহুলাংশেই গ্রামের কৃষকরা যুদ্ধে গিয়েছেন। এই মানুষেরা ভ‚-রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝেন না, সেদিনও বোঝেননি। এরা মুক্তির আকাক্সক্ষা দ্বারা তাড়িত। এদেরকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে প্রধানত আওয়ামী লীগ, সঙ্গে বামপন্থীদের একাংশ। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে একটা অংশ ছিলেন বামপন্থা-প্রভাবিত। কিন্তু গ্রামের বিপুল কৃষক জনসাধারণ ছিলেন মোটের ওপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন। ফলে এ যুদ্ধ ছিল প্রধানত একটি হানাদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণযুদ্ধ। অন্যান্য দেশের মতো দুটি সামরিক বাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চরিত্রগত পার্থক্য এখানেই। বাংলাদেশেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসারদের বড় অংশটাই পক্ষত্যাগ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন এবং তাদের নিয়ে স্বাধীন বাংলা সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল। তারা যুদ্ধের সামরিক নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু নিচের তলায় যে গেরিলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হয়েছিল, তার কৃতিত্ব গণযুদ্ধের জনযোদ্ধাদের। যদিও আজকের দিনে সেই জনযোদ্ধারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ আর সেনা কর্মকর্তা ও শহুরে অল্প কিছু মুক্তিযোদ্ধার নামের আগে বসে গেছে ‘বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দদ্বয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিন গোষ্ঠীর বাঙালি যুদ্ধ করেনি। বরং ক্ষেত্রবিশেষে তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়েছে। এদের মধ্যে মার্কিন দালাল কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা ও শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের একাংশ, চীনের একান্ত অনুসারী চারু মজুমদারের নকশালপন্থী বামপন্থীরা আর সৌদি-পাকিস্তানি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের অনুসারী মৌলবাদীরা। এদের মধ্যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা যারা শান্তি কমিটি গড়ে, রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী গড়ে সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করে যুদ্ধাপরাধ করেছে। বঙ্গবন্ধুর সরকার দালাল আইনে এদের বিচার শুরু করেছিলেন কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি, বর্তমান সরকার সে বিচারকে এগিয়ে নিচ্ছে। আর চীন-নকশাল অনুসারীরা তত্তে¡র মোড়কে মুক্তিযুদ্ধকে অভিহিত করেছে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ হিসেবে। তারা ক্ষেত্রবিশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেও অস্ত্র ধরেছে। কিন্তু তাদেরকে কখনোই যুদ্ধাপরাধী কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তারা এখনও বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দলের ব্যানারে অথবা বিএনপি বা জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে বহাল তবিয়তে রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করছে। এদের কেউ কেউ আবার বর্তমানে ১৪ দলীয় সরকারের শরিকও বটে। আর মার্কিন তাবেদার গোষ্ঠী পেছনের কলকাঠী নেড়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্রেও। ডালিম-রশীদ-নূর-তাহের ঠাকুররা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন ছিল বলেই। এই খুনি গোষ্ঠী আর তাদের পেছনের মেজর তথা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মূল সুবিধাভোগী জিয়াউর রহমান তো একাত্তরেও ছিলেন। এমনকি জিয়া একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত একটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারও ছিলেন। কিন্তু তাদের কৌশল এমনই ছিল যে তাদের কখনোই মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া আপনি রাজাকার বলতেও পারবেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির এদেশীয় নেতা ছিল তারাই।
স্বাধীন বাংলাদেশে এই তিন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বিত সম্পর্ক না হলেও ভেতরগত সম্পর্ক ও ঐক্য বিদ্যমান ছিল। এদের মতাদর্শ ভিন্ন ভিন্ন থাকলেও মূল উপাস্য ছিল পাকিস্তান। এদের প্রত্যেকের মূলগত বিরোধ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে। দেশের জনসাধারণের সঙ্গে এদের সম্পর্ক ন্যূনতম হলেও বিদেশি পরাশক্তির কোনো না কোনো অংশের সঙ্গে এদের নিত্য সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল ও আছে।
বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশের নিজস্ব শক্তির ওপর ভর করে নিজস্ব মডেলের সাম্য ও সমাজতন্ত্রের পথ ধরেন, তখন এই তিন গোষ্ঠীর প্রত্যেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এরাই দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। ডালিম-রশীদ-নূর-তাহের ঠাকুররা সরাসরি অস্ত্র হাতে বঙ্গবন্ধু ও তার পুরো পরিবারকে হত্যা করেছে। সরাসরি তাৎক্ষণিক লাভবান হয়েছে মোস্তাক আহমেদ। আর এই হত্যাকাণ্ডের মূল ও ভবিষ্যৎ সুবিধাভোগী হয়েছে জিয়াউর রহমান। মার্কিন প্রশাসন ও ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে মদদ যুগিয়েছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কাণ্ডারিরা তো লাভবান হয়েছেই। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অধিকার রহিত ছিল, জিয়াউর রহমান গং সে অধিকারকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। তারা আজকের বাংলাদেশে পরিপুষ্ট হয়ে প্রবল শক্তিধর বিষাক্ত ফনা তুলে ধরে আছে আবারও ছোবলের অপেক্ষায়। আর চীন-নকশাল অনুসারীরা বামপন্থীরাও লাভবান হয়েছে। তাদেরও রাজনৈতিক পুনর্বাসন হয়েছে জিয়াউর রহমানের কৃপায়। দলে দলে বিএনপি ও পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তারা স্বার্থ উদ্ধার করেছে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তাদের পার্টির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ই রেখেছে। বাংলাদেশকে তাদের মেনে নিতে অনেক কষ্ট হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ওইসব বামপন্থীদের কেউ কেউ উল্লাসও করেছেন। দিলীপ বড়–য়া প্রমুখ বামপন্থী নেতা সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে ডালিম-রশীদদের ওই পদক্ষেপকে স্বাগতও জানিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর জাসদের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলার অবকাশ নিশ্চয়ই আছে। কর্নেল তাহেরকে কার্যত বিনা বিচারে হত্যা করেছেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু কর্নেল তাহের সে সময় কী করতে চেয়েছিলেন? তিনি কি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন নাকি জিয়াউর রহমানকেই সহযোগিতা করেছিলেন? পরে জিয়াউর রহমানের বেইমানির নির্মম শিকার হতে হলো তাকে? এসব নিয়ে কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগ ও জাসদের নেতাদের বাহাস জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রয়োজনে এ বিতর্ক আরো চলুক। তবু সেদিনের যার যার অবস্থান পরিষ্কার হওয়া খুব দরকার।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে শাসনভার গ্রহণ করার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন। দালাল আইনে এ বিচার কাজ শুরু হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সে বিচারের কাজও থেমে যায়। দালাল আইনে যুদ্ধাপরাধীদের এ বিচার কাজ শুরু হলে কারা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিষ্কারভাবেই তা প্রতীয়মান। খুব স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানপন্থী দালালরা। কিন্তু ন্যাপ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দালাল আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করার বিষয়টিও প্রশ্ন জাগায়। যতদূর জানি, ন্যাপ (ভাসানী) এর সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান জাদু মিয়াও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে দালাল আইনে গ্রেফতার হয়েছিলেন।
মওলানা ভাসানী সে সময় জয়পুরহাটের এক সমাবেশে দালাল আইন বাতিলের আহ্বার জানিয়ে বক্তৃতা করেন এবং তার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে দালাল আইন বাতিল না করলে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করার ঘোষণা দেন। তিনি ওই সমাবেশে অভিযোগ তোলেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে দালালীর অভিযোগে সরকারবিরোধী প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীদের গ্রেফতার করে বিনা বিচারে আটক রাখছে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনকে অবাধ করার লক্ষ্যে দালাল আইন বাতিলের দাবি তোলেন।
জয়পুরহাটে মওলানা ভাসানীর ওই সমাবেশে ভাসানীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী রাশেদ খান মেননও বক্তৃতা করেন। জনাব মেনন মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের হয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিতও করেছেন। পরবর্তীতে নব্বই দশকে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও গণআদালতের আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ অনুসারীও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর অনেক ঘটনাতেই মওলানা ভাসানীর ভ‚মিকা বাংলাদেশের পক্ষে যায় কিনা- তা নিয়ে ঢের প্রশ্ন তোলাই যায়। ইতিহাস নিশ্চয়ই এসব ঘটনার বিশ্লেষণ করবে ভবিষ্যতেও।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতদের বিচার সম্পন্ন করার মধ্যেই সন্তুষ্টি অর্জনের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের প্রয়োজনে, ইতিহাসের প্রয়োজনে এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনেই ওই সময়ের পূর্বাপর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সংগ্রহ ও তার সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষণটাও জরুরি। আমরা আগামী বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পালন করতে চলেছি। মুজিববর্ষের প্রাক্কালে এসে তাই পিতা হত্যার সময়কালের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ শুরু হোক যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ওই সময়কাল নিয়ে কোনো ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে না থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে যে টানাটানির সংস্কৃতি চলে আসছে এ যাবৎকাল, তা থেকে বেরিয়ে একটি একক জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করার সময় এসেছে আজ। লেখক: সাধারণ সম্পাদক
ইয়ুথ ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট