বিএনপির এক দফার আন্দোলন অন্ধকারে
দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির
দাবিতে সরকার বিরোধী এক দফা আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা করেছিল বিএনপি। ঘোষণাই
শেষ আন্দোলনের কোনো খবর নেই। অনেকের মনে করেন বিএনপির এক দফার আন্দোলন এখন
অন্ধকারে।আন্দোলনের আলোর মুখ দেখা যাচ্ছে না শিগগিরই। আন্দোলন হবে কিনা
কিংবা দলের চেয়ারপার্সনের মুক্তি মিলবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত দলটির
সারাদেশের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।
কারাবন্দি দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার
মুক্তি ইস্যুতে এক দফা আন্দোলনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও আগামী দিনে তা
সফল হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে দলটির হাইকমান্ড।
নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, ম্যাডাম খালেদা
জিয়াকে মুক্ত করতে হলে এক দফার আন্দোলনের বিকল্প নেই। আর সে আন্দোলন
ধীরগতিতে চললে কোনো কাজ হবে না। বরং এ আন্দোলন এখন অন্ধকারে চলে যাওয়ার
সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে এক দফার আন্দোলন সফল করতে হলে ঢাকা
মহানগর নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধের বিকল্প নেই। মহানগর নেতাদের সাম্প্রতিক
কয়েকটি কর্মসূচিতে তাদের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট বিএনপির হাইকমান্ড। তাই ধাপে
ধাপে বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে কঠোর আন্দোলনের দিকে যেতে চায় দলটির নেতারা।
যদিও দলটির তৃণমূলের অভিমত ভিন্ন।
তৃণমূলের নেতারা জানান, খালেদা জিয়ার
মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত তারা। তবে নীতিনির্ধারকরাসহ দলের
কেন্দ্রীয় নেতারা তা চান কিনা তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।
কারণ চলতি মাসের শুরুতে এক দফা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে তৃণমূলে
বার্তা দেয়া হয়েছিল। নেতাকর্মীরা প্রস্তুতিও নেয়। কিন্তু এরপর আর কোনো
নির্দেশনা নেই। উল্টো নীতিনির্ধারকদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা
সুস্পষ্ট করে কোনো কিছু বলছেন না। এতে তাদের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে
তৃণমূল নেতাকর্মীর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী
কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ৭৫ বছর বয়সী গুরুতর অসুস্থ খালেদা
জিয়া যদি আপসহীনভাবে কারাগারে থাকতে পারেন, আমাদের তো কারাগারে যেতে কোনো
আপত্তি নেই। সবাই যদি কারাগারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারি তা হলেই সরকার
তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ
চৌধুরী বলেন, আন্দোলন দিনক্ষণ বলে আসে না। এর একটি নিজস্ব চরিত্র থাকে। এ
ধরনের আন্দোলন বাংলাদেশে হয়েছে, বিদেশেও হয়েছে। এটা সত্য মানুষ মুক্তি চায়।
তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফেরত চায়। এসব বিষয়ে
জাতি আজ একতাবদ্ধ। সেখানে সফলতা আসবেই। কিভাবে সফলতা আসবে তা সময়ই বলে
দেবে।
অন্যদিকে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক
নেতা জানান, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সারাদেশে আন্দোলন চাঙ্গা
থাকলেও ঢাকা মহানগরের কারণে তা সফল হয়নি। চেয়ারপার্সনের মুক্তির দাবিতে গত
দেড় বছরে যেসব কর্মসূচি দেয়া হয়েছে তাতে ঢাকা মহানগরের থানার নেতাদের মাঠে
দেখা যায়নি। দশ-বারো জন নেতাকর্মী ব্যানার নিয়ে মিছিল করেছে। সিনিয়র
নেতাদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকার জন্য বার বার
নির্দেশনা দেয়া হলেও ব্যর্থ হয়েছেন তারা। এখন এক দফার আন্দোলন ঘোষণা করা
হলে ঢাকা মহানগরই যদি সক্রিয় না হয়, তা কখনই সফল হবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে
নতুন করে ভাবছে বিএনপি।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের
সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার বলেন, বিএনপির থানা-ওয়ার্ডের নেতাদের এক
জায়গায় জড়ো হতে দেয়া হয় না। তাদের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নয়, পুলিশকে
মোকাবিলা করতে হয় এটা একটি কারণ। আবার আমাদের কমিটির মেয়াদ শেষ। যদি আমাদের
৭০ জনের কমিটিও সক্রিয় থাকে, কম নয়। এ ছাড়া এখনো ওয়ার্ডগুলোর পূর্ণাঙ্গ
কমিটি করতে পারিনি। এক জায়গায় বসে যে নেতাকর্মীদের মতামত শুনব সেই
পরিস্থিতিও নেই। পুলিশ বাধা দেয়। তার পরও কেন্দ্র থেকে যদি সুস্পষ্টভাবে বড়
ধরনের কর্মসূচির কথা জানায় তা হলে তা সফল করব।
দলটির মধ্যম সারির নেতারা জানান, বিএনপির
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বেশিরভাগ নেতাই মনে করেন সরকারকে
রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে না পারলে খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না। এ জন্য
চেয়ারপার্সনের মুক্তির ইস্যুতে রাজপথের আন্দোলন জোরদার করতে হবে। সম্প্রতি
দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এক দফার আন্দোলনের নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয়া হয়।
পাশাপাশি এক দফার আন্দোলনের আগে ধাপে ধাপে বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে
নেতাকর্মীদের রাজপথে রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
জানা গেছে, দলের ১১টি অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের
মধ্যে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা কিছুটা সক্রিয়
রয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে উল্লিখিত সংগঠনের নেতাকর্মীদের অনেক সময় দেখা
গেলেও জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, তাঁতীদল, শ্রমিক দল, মহিলা দল, মৎস্যজীবী দলের
কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত
চেয়ারম্যানসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
এ ব্যাপারে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক
সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সাংবাদিকদেরকে বলেন, দলের একজন সাধারণ
কর্মী হিসেবে মনে করি, রজনীগন্ধা আর রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে কখনো সরকারের পতন
ঘটানো যাবে না। বর্তমানে গণতন্ত্র জেলখানায় বন্দি। গণতন্ত্র ও দেশনেত্রী
খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হলে রাজপথের আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে হবে। আপস
না সংগ্রাম— এ কথা বললে হবে না, আপস আপসই। আর হয় এসপার, নয় ওসপার। রাতের
অন্ধকারে আওয়ামী লীগ নেতাদের পেছনে লাইন ধরে থাকবেন, আর দিনের বেলায় বিএনপি
করবেন— দুই দিকে থেকে সরকার পতন হবে না।
