শিনোনাম

‘বিপর্যয়ের’ আশঙ্কা ডেঙ্গু চিকিৎসায়

অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর মৌসুম গড়াতে পারে এমন আশঙ্কা স্বাস্থ্য অধিদফতরের। চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুর মৌসুম যদি আরো দেড় মাস বাড়ে তাহলে ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসাসেবায় নিশ্চিত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। হঠাৎ এ বছর ডেঙ্গুর ধরন পাল্টানো এবং রোগীর চাপ বাড়ায় হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে নার্স, চিকিৎসক, বেড সঙ্কট রয়েছে। অনেক হাসপাতালে আইসিইউ সঙ্কট আছে। বাড়তি চাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিও বিকল হয়ে যাবার উপক্রম। যত রোগী ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সঙ্কট।
রাজধানীসহ দেশব্যাপী সরকারি হিসাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ১০৪ জন। এ ছাড়া শক সিনড্রোমের কারণে শিশু, গর্ভবতী মা এবং প্রবীণরা ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। পরিস্থিতি বেশি জটিল হলে জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে মত দেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
তারা বলছেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। সরকার চাইলে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, স্কুল, কলেজকে জরুরি ভিত্তিতে ডেঙ্গু চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে এবং বিভিন্ন মেডিকেল থেকে অস্থায়ীভাবে চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ দিতে পারবে। এমনকি বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সহযোগিতা নিতে পারবে। রাজধানীসহ সারাদেশে রোববার দুপুর ৩টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ১৭০৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে রাজধানীর ৪১টি হাসপাতালে ৭৩৪ জন ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে ৯৭২ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ১৬৮। তাদের মধ্যে রাজধানীতে ৩ হাজার ৬৬৮ ও বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে ৩ হাজার ৫০০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল ১৮ আগস্ট রোববার পর্যন্ত সারাদেশের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ১৮২। তাদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪৫ হাজার ৯৭৪ জন।
প্রতিদিন যে হারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মৌসুম দীর্ঘ হলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী, মিটফোর্ড, মুগদা, ঢাকা মেডিকেল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে যেভাবে রোগীর চাপ রয়েছে তা বাড়বে এবং চিকিৎসা সঙ্কট দেখা দেবে। এ ব্যাপারে সরকারের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগামী ৭ দিন খুবই চ্যালেঞ্জিং মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা পরিচালক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, আবহাওয়া আমাদের অনুক‚লে নেই। এই ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহর যেটা বিশ্বের সবচাইতে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটি। আগামী ৭ দিনের মধ্যে আমরা যদি এডিস মশার দুর্গ ধ্বংস করতে না পারি এবং পরিবেশ যদি আমাদের অনুক‚লে না থাকে তাহলে আমরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়ব।
ডেঙ্গুর প্রকোপ অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে চিকিৎসাসেবায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন হাসপাতাল পরিচালকরা। বাড়তি চিকিৎসক, নার্স নেই হাসপতালগুলোতে। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা কতটুকু নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে পারবেন তা নিয়ে সন্দিহান সবাই। তাই সরকারকে বাড়তি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের আহŸান জানান তারা। ডেঙ্গুর বর্তমান অবস্থায় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রয়োজন আছে কি না সে বিষয়ে অনেকেই একমত পোষণ করলেও প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। সবাই বলছেন, এটা সরকারের নীতিগত বিষয়। সরকার কীভাবে ডেঙ্গুর মোকাবিলা করবে সেটা তাদের বিষয়।
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া বলেন, ‘সক্ষমতার চেয়ে তাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। এদের সেবা দিতে গিয়ে তারা ক্লান্ত। ইতোমধ্যে অনেক চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাড়তি চাপে প্রায় পরীক্ষার মেশিন বিকল হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা। এর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ যদি অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে তাহলে অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা অনুমান করা মুশকিল।’
রাজধানীর শিশু হাসপাতালের পরিচালক সৈয়দ শাফি আহমেদ মুয়াজ জানান, আমার হাসপাতালে মোট শয্যা ৬৫০টি। শয্যার বাইরে বাড়তি বিছানা দেয়ারও সুযোগ নেই। রয়েছে আইসিইউ ও চিকিৎসক সঙ্কট। ফলে ইতোমধ্যে গুরুতর অসুস্থ ছাড়া অন্যদের ভর্তি করানো সম্ভব না। তবে প্রয়োজন হলে হাসপাতালের প্রবেশ গেটে শেড দিয়ে আইসিডিডিআরবির মতো কয়েকটি বিছানা বৃদ্ধি করব।’
ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের প্রয়োজন একটি মেনুফেস্টো তৈরি করা। কীভাবে সরকার এটার মোকাবিলা করবে তার একটি ফর্মুলা তৈরি করে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া। এ ছাড়া সারাদেশে ৫ হাজারের বেশি ছোট-বড় বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে, সরকারের উচিত সেখানকার চিকিৎসকদের একটি টিমের মাধ্যমে ডেঙ্গু বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া। তাহলে চিকিৎসকদের সঙ্কট কিছুটা লাঘব হবে।’
জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ফিলিপাইন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। আমরা সেখানকার ভেতরকার পরিবেশ এখনো জানি না। তবে জরুরি অবস্থা ঘোষণার চেয়েও বেশি প্রয়োজন চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষিত করে তোলা। ডেঙ্গু নিয়ে আরো গবেষণা করা।’